শুভ্র অন্ধকার

দুই ঘন্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট হল তিথিদের বাসার সামনে নির্বিকারে দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে দাঁড়িয়েছি তার পাশেই হেলাল মামার টঙ দোকান। লোকটা ভীষণ ভদ্র এবং বিনয়ী বটে। রোজ এখানে এসে দাঁড়াই বলে কয়েকদিনের মাঝে তার সঙ্গে আমার মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক কায়েম হয়ে গেছে। তাই উনাকে আর মুখ বাড়িয়ে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলাম না। উনি নিজ থেকেই বুঝে গিয়েছেন আমার এখন এক কাপ লাল চা দরকার। উনি কড়া এক কাপ চা বানিয়ে থামিয়ে গেলেন আমার হাতে। চায়ের গরম কাপ হাতে নিয়ে আমি অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি সামনের বাড়িটার দিকে। ওই বাড়ির চার তলার ফ্লেটেই তিথিরা থাকে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মাঝেমাঝে তিথিকে এক ঝলক দেখবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে ওর রুমের ক্ষীণ আলোয় স্পষ্ট কিছু দৃষ্টিপাত করা যাচ্ছে না, তবে যদ্দুর আলোর ছায়া দেখা যাচ্ছে তাতে বলা যায় ওটা তিথি ছাড়া আর কেউ নয়। আশেপাশে একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম। সামান্য দূরে একদল মহিলা রঙ-বেরঙের শাড়ি পরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। রাত এগার-বারটা বাজবার কথা। এমনসময়ে ওদের এরকম কর্মকান্ড দেখে সবারই ব্যাপারটা বুঝা উচিত যে ওরা প্রস্টিটিউট। ওখানে দাঁড়িয়েছে কোন গ্রাহকের সন্ধানে। তবে সেখানকার একজন মধ্যমবয়সী প্রস্টিটিউট আমার দিকে তার ছানাবড়া চোখে অনিমেষদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। হয়তো বা সে ভাবছে আমিও সেই কুকুর-শ্রেণির মানুষ যে এত রাতে এমন নির্জন গলিতে ওদের সন্ধানেই গৃহত্যাগী হয়েছে। কিন্তু কে তাকে বুঝাবে যে আমি ওদের মধ্যে কেউ নই? একটু পরেই ওখানে দুইটা পুলিশের জিপ হাজির হয়ে ওদের সবাইকে তুলে নিয়ে গেল। এমনকি ওদের আশেপাশে যেসব গ্রাহকেরা ঘুরঘুর করছিল ওদেরকেও। ইচ্ছে করলে আমাকেও ধরতে পারত। তবে ধরল না। এখানে অবশ্য সপ্তাহখানেক আগে ঘটে-যাওয়া একটা ঘটনার বিস্তৃত জানানো দরকার। সেদিনকে আমি যথারীতি তিথিদের বাসার সামনে নির্বিকারে দাঁড়িয়ে আছি। এমনিসময় হুট করে পেছন থেকে কেউ আমাকে জিগ্যেস করে বসল, “এই যে স্যার, এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন?” আমি জবাব দেবার জন্যে বক্তার দিকে তাকালাম, দেখলাম লোকটা পুলিশ। পুলিশ দেখতেই আমার মধ্যে অস্বস্তিবোধ কাজ করতে শুরু করল। উনাদের একটা প্রশ্নের উত্তরও গুছিয়ে বলতে পারলাম না, শুধু আমতা আমতা করে গেলাম। উনারা ভাবলেন আমি হয়তো এখানে কোন প্রস্টিটিউটের সন্ধানেই এসেছি। সোজা তুলে নিয়ে গেলেন থানায়। তবে আমার কপাল ভাল যে সেখানকার ওসি সাহেব লোকটা খুব ভাল এবং বিনয়ী। তিনি আমার কথাগুলো শুনে আমার সম্পর্কে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেন, অত:পর আমাকে ছেড়ে দিলেন। হয়তো বা এই কারণেই পুলিশ আজকে আমাকে গ্রেফতার করেনি। এক সপ্তাহের মধ্যে আমার মতন এত বিশ্রী চেহারা উনাদের এত সহজে ভুলে যাবার কথা নয়। হেলাল মামা একটা বাউল গান ধরেছেন। বোধ হয় দোকানে কোন কাস্টমারের উপস্থিতি না-থাকাই উনার গান ধরার কারণ। দীর্ঘদিন ধরে উনার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা থাকলেও আমার আইডিয়া পর্যন্ত ছিল না উনি গানও জানেন। উনার দোকানের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চটাতে পাকাপোক্ত হয়ে বসলাম। উদ্দেশ্য নিজের সমগ্র একাগ্রতা দিয়ে উনার গান শোনা। উনি গান গেয়ে যাচ্ছেন। গানের চরণগুলো ছিল এমন- যারে ভাবলাম আপন বলে প্রাণ সঁপিলাম চরণতলে সে করলো ছলনা সরলে মিশাইলো গরল, আর ফিরে চাইলো না। আমি বাউল গান কখনো শুনিনা। তবে মামার এই গানটা বেশ ভাল লাগল। গানের চেয়েও ভাল লাগল উনার গায়নী। উনার একটু প্রশংসা করা উচিত বলে বোধ হল। করলাম। তার সাথে অনুরোধও করলাম গানটা আবার গাইবার জন্যে। মামা বিন্দুমাত্রও ইতস্তত করলেন না, শুরু করে দিলেন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান শোনবার পর সামনে তিথিদের ফ্লাটের দিকে তাকালাম- তিথির রুম এখন সম্পূর্ণ অন্ধকার। তার মানে মেয়েটা ইচ্ছে করেই তার রুমের লাইট সব অফ করে দিয়েছে! তিথি ভালভাবেই এই বিষয়ে অবগত যে আমি প্রতিদিন একটা প্রভুহীন কুকরের মতন ওর বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকি! একটা লিমিট পর্যন্ত সময় অবধি দাঁড়িয়ে থাকলে ও কিছু মনে করে না, তবে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ভীষম বিরক্ত হয়। তখন নিজের রুমের লাইটগুলো অফ করে দেয়! এখন আমার যাওয়া উচিত। তিথি বিরক্ত হচ্ছে। মামাকে চায়ের বিল চুকিয়ে হাঁটা ধরলাম নিরুদ্দেশ কোন যাত্রার পথে। তবে কালকে কিন্তু আবার এখানেই আসব। সন্ধ্যের পরপর এসে এখানেই দাঁড়াব। তারপর যখন মেয়েটা এক পর্যায়ে আমার উপর বিরক্ত হয়ে নিজের রুমের লাইটগুলো অফ করে দিবে তখন আবার চলে যাব। এখন আমি হেঁটে চলছি। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যেতে হবে। কারণ আমি কোনোভাবেই তিথিকে বিরক্ত করতে চাই না! (অসম্পূর্ণ তবে সমাপ্ত)
Share on Google Plus

About K. M. Emrul Hasan

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment