সে স্বতন্ত্র কথা

আমাদের বাসাটা চিপা গলির মত সব বিল্ডিং এর মধ্যখানে চিপায়।মানে চারিদিকের সব উঁচু উঁচু দালানগুলো আমাদের ছোট আকৃতির এই বাসাটাকে প্রায় গিলে ফেলেছে।ছাদে যেতে সেজন্যেই ভাল লাগে না,আশে-পাশের বদ্ধ জানলা দেখতে দেখতে বড় বিরক্ত লাগে।তবুও বাধ্য হয়ে কাপড় শুকাতে ছাদে যেতে হয়।ফুলের প্রতি আমার খুব আসক্তি তাই ছাদের একপাশে কয়েক ধরনের ফুলের গাছ আছে টবে,অর্কিড আছে তার মাঝে কয়েকটা ফুল ফোটেনি এখনও,ফুটবে বলেও মনে হয়না।ইদানিং যত্ন নেয়া হচ্ছে না একদম।কয়েকদিন থেকেই কেন জানি ছাদে গেলেই মনে হয় পাশের বাসাটার বারান্দায় ছায়ামূর্তির মত কে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে খুব অস্বস্তি লাগে তখন দ্রুত ছুটে পালাই তাকাতেও ভয় হয়।এখন আমাদের বাসার কথা বলি,আমাদের পরিবারে বড় চাচাই প্রধান কর্তা তাকে সবাই যমের মত যেমন ভয় পায় তেমনি তার কথা মানে ও।আমার বাবা তার মাঝে একজন উনি চাচার কথা ছাড়া এক পা ও এগুবেন না।যেমন বাড়িটা বানানোর সময় বাবা বললেন সবার জন্যে একটা করে রুম বরাদ্দ থাকবে আর ফুফুদের জন্যেও সাথে টুকুন আর বাবুল এর জন্যেও সেই হিসেবে আমিও একটা রুম পাবো ভাবতেই খুশী লাগছিল কিন্তু বাধ সাধলেন চাচা উনার মতে মেয়েদের আবার আলাদা রুম কি?ওরা থাকবে মা-দাদীদের সাথে।আর ফুফুদেরও আলাদা ঘর কেন?চাচার মতে ওরা দু একদিনের জন্যে আসবে কোনমতে একটা ঘর হলেই হবে বাকিটা টুকুন আর বাবুলের পড়ার রুম করা হবে।বাবা তাই করলেন।বড় চাচা মোটামুটি বেকার হলেও এই সংসারে তার কদর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মত।সেদিন আমার কি যে খারাপ লাগছিল খুব মন খারাপ হয়েছিল,প্রত্যেক দিন রাতে দাদীর সাথে ঘুমানো যে কি বিরক্তির তা আমি জানি।উনার বকবক সারারাত চলতেই থাকে মাঝে মাঝে রাতে উনার হাঁপানীর টান উঠে তখন ক্রমাগত চেঁচাতে থাকেন আমাকে ঘুম থেকে উঠে ইনহেলার দিতে হয় তাও যদি রেহাই মিলত একবার তার ঘুম চটে গেলে আর ঘুমান না গল্প করতেই থাকেন আর আমাকেও তা শুনতে হয়। 'শোন বইন এক রাইতে তোর দাদা বাইম মাছ নিয়া বাড়ি ফিরছিল তখন তার সাথে কেমনে পেত্নি লাগে সেই কাহিনী বলি' চুপ কর তো দাদী এই গল্প এর আগে অনেকবার বলছো এখন ঘুমাতে দাও।দাদাজান কেমনে যে তোমার মত জীবন্ত পেত্নিকে সহ্য করেছিল কে জানে! এই কথাতে কাজ হয় দাদী চুপ মেরে যান।তারপর ও বাকিটা রাত আমার ঘুম আসে না,ইচ্ছে করে দাদীকে বলতে তোমার আর দাদাজানের বিয়ের গল্পটা বল দাদী।এই গল্পটা বলার সময় দাদী খুব যত্ন করে চুলে বিলি কেটে দেন,দাদার গল্প বলতে গিয়ে দাদীর চোখে-মুখে গভীর মমতা ফুটে ওঠে তা দেখতেও ভাল লাগে।কিন্তু কেন জানি বলিনা মুখের কথাটা বাইরে প্রকাশ করতে ইচ্ছে করেনা।আমি এমন কেন হয়ে যাচ্ছি?আচ্ছা এমন কেউ যদি থাকতো যাকে কিছুই বলতে হবেনা সে মুখের ভাব দেখেই সব বুঝে যাবে,যেমন আমার প্রচন্ড ইচ্ছে করে নির্জন সবুজ খোলা কোন একটা মাঠে।যেখানে নীল স্বচ্ছ আকাশ এসে নেমেছে, ধু ধু সবুজ প্রান্তরে শ্বেত শুভ্র কাশফুল দোল খেয়ে যায়।সে এসে কোনরকম প্রশ্ন না করেই আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে,মানুষের মনের কথা বুঝা কি খুব অসাধ্য? দুপুরে ছাদে যেতে যেতেই আজ ভেবেছি একবার হলেও ঐ বারান্দার দিকে তাকাবো।আমার মনে হয় নিশ্চয় কোন খারাপ ছেলে-টেলে হবে আড়াল থেকে খেয়াল করে।কিন্তু না ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখি সেখানে কেউ নেই,তবে আমার কেন এমন মনে হয়?লাগে যেন কেউ একজন একনজরে তাকিয়ে থাকে!ধ্যাত হয়ত আমার মনের ভুল এভাবে তো আর প্রতিদিন কেউ দাঁড়াবে না।তবু কেন জানি আমার ভাবতে ভালো লাগে কেউ একজন থাকে সেখানে এটাকে কি বলে?আজ আর ফুলের গাছগুলোকেও দেখা হয়না,চলে আসি ছাদ থেকে ভাল লাগছে না কিছু। সকালে বড় চাচার রুমে আমার তলব পড়েছে উনি ডাকা মানেই একগাদা উপদেশ আর নিষেধ।টেনশনে ছিলাম আমার ঘন ঘন ছাদে যাওয়াও হয়ত উনি টের পেয়ে গেছেন তাই ডাকছেন।কিন্তু উনার রুমে গিয়ে দেখি আবহাওয়া পুরা বদল,কোমল কন্ঠে চাচা আমাকে বসতে বললেন। 'কি রে লিলি তোর পড়াশুনার কি খবর?' জ্বী চাচা ভাল কোনমতে বললাম। 'কলেজে যাস ঠিকমত?পরীক্ষা কবে?' উনার কথায় অবাক হলাম আমার চাচা মোটামুটি নিজের জগতে বাস করেন সেখানে কারো খোজ খবরই রাখেন না আর আজ কিনা আমার পড়াশুনার খোজ নিচ্ছেন।ব্যাপারএকটা নিশ্চয় আছে উনি বিনা কারনে কাশিও না দেয়া টাইপ মানুষ।মায়ের কাছেই গিয়ে কারণটা জানলাম,বড় চাচা নাকি আমার বিয়ে ঠিক করেছেন ছেলে ডাক্তার এই মাসেই বিয়ে।আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝে উঠে পারছি না ভিতরটা ফেঁটে যাচ্ছে,এই বাড়ির মানুষ এমন কেন!আমার মা হয়ত আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছেন,মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন "মন খারাপ করিস না মা মেয়েদের মন খারাপ করতে নেই।মেয়েরা হচ্ছে একটুকরা চাঁদের মত সদা উজ্জল,তার ভিতরে হাজার খানা খন্দ থাকলেও বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।রাতে চাঁদ উঠলে আকাশ আলোকিত হয় তুইও তেমন হওয়ার চেষ্টা কর মা।ভিতরের কষ্টটা বাইরে বেরুতে দিস না তাতে তোর সৌন্দর্য নষ্ট হবে।" মাকে বলতে গিয়েও বললাম না আমার সামনে ফাইনাল পরীক্ষা,আমার এতদিনের বুনা স্বপ্নটার কথা।কি হবে আর বলে?উনার কথাই হয়তো ঠিক আমাদের মন খারাপ করতে নেই।মন খারাপ না করতেই ছাদে গেলাম আমার কথা বলার কেউ নেই মাঝে মাঝে ফুলেদের সাথে কথা বলি।আজ কেন জানি তারাও চুপসে গেছে ,আমি প্রতিদিন আশা নিয়ে টবের সামনে দাঁড়াতাম নীল নীল অর্কিড দেখবো বলে কিন্তু অর্কিড আজো ফুটে নি আমিও হয়ত আর আশা নিয়ে ছাদে আসবো না।এত খারাপ কেন লাগছে! এটাই কি শেষ ছাদে আসা? একটু পর আমার বিয়ে বাড়িতে মেহমানদের খুব হইচই,চাচার মতে এত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিয়ে দেয়ার কি আছে ?বরপক্ষ আসবে কলেমা পড়ে খাওয়া দাওয়া করে বউ নিয়ে যাবে ব্যাস!আমার তাতেও খারাপ লাগছে না বরং ভালই হয়েছে আমার বিয়েতে মা-বাবার বাজে খরচ হল না।মা বলেছিলেন আমার বান্ধবীদের দাওয়াত দিতে,মা জানেন না আমার তেমন কোন বান্ধবী নেই।মিলিকে বলা যেত কিন্তু ও যা হাই ফাই আমাদের এই বাড়িতে আসবেই না তাই বলি নি।কনে হওয়ায় আমার কোন কাজ নেই বসে বসে দেখা ছাড়া।তার মাঝেই টুকুন হঠাত একটি খাম এনে দিলো।আমাকে চিঠি দিবে কে?মা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন উনাকে বললাম তুমি আমাকে ১০মিনিট সময় দাও তো মা আমি চিঠিটা পড়ব।বলেই দরজা লাগালাম।চিঠিটা খুলতেই মায়া হচ্ছে অদ্ভুত একটা সুঘ্রাণ পেলাম খামটা খুলতেই।গুটি গুটি হাতের লম্বা একটা চিঠি,জীবনের এমন একটা সময়ে তা পাবো ভাবিনি কখনও আমি।
Share on Google Plus

About K. M. Emrul Hasan

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.
    Blogger Comment
    Facebook Comment

0 comments:

Post a Comment