মধ্যরাতের সময়। ফুটপাতের উপর দিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে চলছি। আশেপাশে কোন মানুষ-ভূত-প্রেতের লেশমাত্র চিহ্ন পর্যন্ত নেই। থাকার মধ্যে শুধু আছে ধূসর রঙের লাইটের আলো। দূরে আবিশ্যি কতকগুলো কুকুরও দেখা যাচ্ছে। ওরা এতক্ষণ শান্ত থাকলেও আচমকা কাউকে দেখায় চটে বসেছে। ওদের ঘেউঘেউ আওয়াজটা বেশ বিরক্তিকর বটে!
কুকুরের সমস্ত দলবল ক্রমশ জোরে ঘেউঘেউ করে যাচ্ছে। তবে আমি সেদিকে মনযোগ দিচ্ছি না। ওদেরকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে চলছি। কুকুরগুলো ইচ্ছে করলে কিন্তু আমার পিছু নিতে পারত, তবে কেন যে নিল না এটা আমার চেয়ে ওরাই ভাল বলতে পারবে!
উদাস-মনে ধূসর ফকফকে আলোর ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে খোঁজ পাওয়া গেল একটা টঙ দোকানের। দোকানটা এখনও খোলা। ঢাকা শহরের চিপা-চাপায় আবিশ্যি অন্তত এমন একটা টঙ থাকে যেটা ২৪*৭ খোলা। এটাও বোধ হয় সেই শ্রেণীরই একটা দোকান। দোকানটাতে যাওয়া যেতে পারে। এই মাঝরাতে একটু চা আর সিগারেট হাতে পাওয়া গেলে তার কোন তুলনাই হয় না। কাঠের বেঞ্চটাতে চুপ করে বসে পড়লাম, এখনও মামাকে চা-সিগারেট কিছুর কথা বললাম না। আর আমিও যে তার দোকানে এসে বসেছি সেটাও তিনি খেয়াল করেছেন বলে বোধ হয় না। যাক গিয়ে... আগে একটু শান্তু পূবালী বাতাস অনুভব করে নিই!
এমনি হুট করে আরেক ভদ্রলোক আমার পেছনের বেঞ্চে এসে বসলেন। লোকটার বয়স মধ্যম শ্রেণীর। তাকে এই মাঝরাতে দেখে আমি একটুও চমকালাম না। ধরেই নিলাম ইনিও বোধ হয় আমার মতন শখ করে আজকে নিরুদ্দেশ পদযাত্রায় বের হয়েছেন।
এতক্ষণে গিয়ে দোকানদার মামার দৃষ্টি গিয়ে স্পষ্টভাবে আমার উপর পড়ল। জিগ্যাসা করলেন, ‘স্যার, এত রাতে এখানে আসলেন যে?’
জবাব দিলাম, ‘আসলাম- এমনি।’
‘স্যার, আপনার কি আপনার ম্যাডামের সঙ্গে ঝগড়া হইছে নাকি?’
‘ধরে নেন ওইটাই।’
‘হুম বুঝছি, স্যার। আজকে আপনার শান্তিতে ঘুম হইব না। তবে স্যার আপনে চাইলে কিন্তু আমি আপনার জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে পারি!’
দোকানদারের কথার ভঙ্গিমা শুনেই চট করে বুঝে ফেললাম উনি আমাকে কোন পতিতার সঙ্গে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থার প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে আমি তো এমন পুরুষ নই। আসল পুরুষদের জীবনে তো একটাই স্ত্রীলোকের স্পর্শ থাকে, এর বেশী না।
দোকানদার মামার কথা আমার পৌরুষে আঘাত হানলো। এখন এখানে আরেক মিনিট স্থান নিলেও সেটা আমার ইগোতে হার্ট করবে। তাই চা-সিগারেট কিছু খাওয়ার আগেই সেখান থেকে কেটে পড়তে নিলাম। তবে বললেই কেটে পড়া হয় না। পেছনে যেই ভদ্রলোকটা এসে বসেছিলেন, তিনি এতক্ষণে গিয়ে উনার মুখ খুলে আমাকে উদ্দেশ্য করে বিনীতভাবে বললেন, ‘ভাই, এসব বজ্জাতের কথায় কান দিয়ে মন বেজার করবেন না। এদের স্বভাবই হচ্ছে এমন, আর এরা মানুষই হচ্ছে এত নীচ! তার চেয়ে বরং আপনি আমার পাশে বসে আমার সঙ্গে এক কাপ লাল চা খেয়ে নিজেকে রিফ্রেশ করুন। দেখবেন অনেক ভাল্লাগছে!’
ভদ্রলোকটার কথা বলার ভঙ্গিমায় কিছু আছে। তার কথা ফেলবার উপায় নেই। তাই চা খেতে বসে পড়লাম!
ভদ্রলোকটা ঠিকি বলেছিলেন। এক কাপ লাল চা আসলেই আমাকে পুরোপুরি রিফ্রেশ করে দিল। এখন এই চায়ের সঙ্গে শুধু একটা সিগারেট জুটে পড়লে আর তো কোন কথাই নেই। এই বিষয় নিয়েই মনের মাঝে সাত-পাঁচ ভেবে সিদ্ধান্তহীনতায়ভুগছিলাম যে আমি আগ বাড়িয়ে সিগারেট নিব নাকি উনি উনার চায়ের কাপ শেষ করে নিজ থেকে আমাকে সিগারেট অফার করবেন, কোনটা!
ভদ্রলোক উনার চায়ের কাপ শেষ করে আমার দিকে তীক্ষ চোখে তাকালেন। বললেন, ‘আমি সিগারেট খাই না!’
আমি বললাম, ‘সমস্যা নেই। তাহলে আমিই খাই। আপনার সামনে সিগারেট খেলে আপনি কিছু মনে করবেন না তো?’
‘না, তা অবশ্য করব না। তবু আপনি সিগারেট খেতে পারবেন না’
ভদ্রলোকটা এমনভাবে বললেন যেন উনি আমাকে সিগারেট না-নেয়ার জন্যে হুকুম দিচ্ছেন, আর আমাকে সেই হুকুম মান্য করতেই হবে। ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অপ্রকৃতিস্থ বলেই বোধ হল। খানিকটা গরম হয়েই জিগ্যাসা করলাম, ‘কেন- সিগারেট কেন খেতে পারব না?’
‘এই সিগারেটকে কেন্দ্র করেই না আপনার সাথে আজকে সাদিয়ার ঝগড়া হয়েছে?”
তার কথা শুনে আমি পুরোপুরি বিস্মিত এবং হতভম্ব। ‘কিন্তু আপনি এ-কথা জানলেন কী করে? আর আপনি সাদিয়াকেই বা চিনেন কীভাবে?’
‘সে অনেক কথা। এখন শুনুন- আর দেরী না করে সাদিয়ার বাসার সামনে চলে যান। দেখবেন মেয়েটা ওর রুমের বারান্দায় গুমরে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি গিয়ে ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়ালেই ও আপনার দিকে ছুটে আসবে। আপনি তাড়াতাড়ি যান। চায়ের বিল নিয়ে চিন্তা করবেন না, ওটা আমি চুকিয়ে দিব। আর ওর সাথে সব মিটমাট হবার পর এখানে আবার আসার দরকার নেই। আমাকে পাবেন না। তবে চিন্তা করবেন না। আপনি খুব ভাল একটা মানুষ। এর প্রমাণ আমি পেয়ে গিয়েছি। আপনি যান। ভবিষ্যতে যদি ফের এমন কোন বিড়ম্বনায় পড়েন, তাহলে ইনশা’আল্লাহ আমাদের দেখা হবে।’
ভদ্রলোকটাকে প্রথমে বাবা-টাইপের মানুষ, পরে সাইকো, লাস্টে আবার একটা বাবা-টাইপের মানুষ মনে হয়েছে। এমন মানুষদেরকে আমি বিশ্বাস করি না। সাদিয়ার বাসায় যাওয়ার চেয়ে আমার নিরুদ্দেশ পদযাত্রা কায়েম রাখাটাই শ্রেয় বলে বোধ হচ্ছে। তবে কৌতূহল জিনিসটা কৌতূহলই। সাদিয়ার বাসার দিকে না-গিয়ে আর নিজেকে শান্ত করতে পারলাম না। তবে ওর বাসার দিকে পৌঁছিয়ে নিজেকে আরও শান্ত করতে পারলাম না। ওই ভদ্রলোকটার কথাটাই ঠিক। এই মাঝরাতে সাদিয়া ঠিকি বারান্দায় মুখ গুমরে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝেমাঝে ওর চোখ বেয়ে দুয়েক ফোঁটা পানিও বেরিয়ে আসছে আর সেই পানিতে ওর গাল ভেসে যাচ্ছে।
ওদের বাড়ির গেট মুখোমুখি নাম-না-জানা একটা গাছের নীচে দাঁড়ালাম। সেখানে আমার উপর সড়কের লাইটের ফকফকে ধূসর আলো সরাসরিভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সাদিয়াও ইতোমধ্যে আমাকে দেখে ছুটে চলে এসেছে, আমাকে জোরে আলিঙ্গনও করেছে।
ভদ্রলোকটার কথাই সত্যি হল। আমি নিশ্চিত উনি কোন মানুষ ছিলেন না। আবার মানুষ হতেও পারেন না। বাস্তবিক অর্থে এই দুনিয়ার সব লীলাখেলার সূত্র মানুষের বুঝবার ক্ষমতার বাহিরে।
- Blogger Comment
- Facebook Comment
Subscribe to:
Post Comments
(
Atom
)
0 comments:
Post a Comment